বাংলাদেশের সেরা ১০ পর্যাটন স্পট

nijhum-deep1কক্সবাজার:
ছুটিতে বেড়িয়ে আসার জন্য পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের তুলনা হয় না। সারি সারি ঝাউবন, বালুর নরম বিছানা, সামনে বিশাল সমুদ্র। কক্সবাজার গেলে সকাল-বিকাল সমুদ্রতীরে বেড়াতে মন চাইবে। আর রয়েছে নীল জলরাশির গর্জন। মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, শাহপরী, সেন্টমার্টিন কক্সবাজারকে করেছে দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। এ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে মাতা মুহুরী, বাঁকখালী, রেজু, কুহেলিয়া ও নাফ নদী। পর্যটন, বনজসম্পদ, মৎস্য, শুঁটকি, শামুক, ঝিনুক ও সিলিকাসমৃদ্ধ বালুর জন্য কক্সবাজারের অবস্থান তাই ভ্রমণবিলাসী পর্যটকদের কাছে সবার শীর্ষে।

এখানে গিয়ে বেড়াতে পারেন হিমছড়ি ও ইনানী বিচে। কক্সবাজারের ১২ থেকে ২২ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে রয়েছে এ দুটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান। যারা ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজার যেতে চান তারা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার অথবা সরাসরি বাসে কক্সবাজারে যেতে পারেন। এসি ও নন এসি, ডিলাক্স ও সাধারণ বাস সরাসরি পরিবহনের ভাড়া পড়বে ৩৯০-৭৩০ টাকা পর্যন্ত। বিচ কক্সবাজারে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের বেশকটি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট। সর্বনিম্ন ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ সাত হাজার টাকায় কক্সবাজারে রাতযাপন করা যায়। অন্যান্য হোটেল রেস্ট হাউসের ভাড়া প্রায় নির্ধারিত। তবে কক্সবাজার ভ্রমণের আগে ফোনে যোগাযোগ করে বুকিংমানি পাঠিয়ে আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ভালো। এ ছাড়া বেড়াতে পারেন সেন্টমার্টিন। আকাশের নীল আর সমুদ্রের নীল সেখানে মিলেমিশে একাকার। তীরে বাঁধা নৌকা, নান্দনিক নারিকেল গাছের সারি আর ঢেউয়ের ছন্দে মৃদু পবনের কোমল স্পর্শ- এটি বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন প্রবাল দ্বীপ। বাংলাদেশের যে কোনো স্থান থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়ার জন্য আপনাকে প্রথমে যেতে হবে কক্সবাজার। কক্সবাজার থেকে প্রথমে জিপে চড়ে টেকনাফ, টেকনাফ থেকে সি-ট্রাক, জাহাজ কিংবা ট্রলারে চড়ে পৌঁছবেন সেন্টমার্টিন। সেখানে থাকার জন্য বেশ উন্নতমানের কয়েকটি হোটেল ও কটেজ রয়েছে। এ ছাড়া আরও আছে বিচ ক্যাম্প।

সুন্দরবন:

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর বিশ্বের ঐতিহ্য (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ) সুন্দরবন। এখানকার সব কিছুই বিস্ময়ে ভরা। দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে সরাসরি খুলনা শহরে এসে হোটেলে অবস্থান করে পছন্দের ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সুন্দরবন যাত্রা করা যায়। আবার হোটেলে না উঠে সরাসরি ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও নির্ধারিত সময়ে জাহাজে চড়ে সুন্দরবন ভ্রমণ করা যায়। প্রায় ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এই সুন্দরবন ২৪ ঘণ্টায় কমপক্ষে ছয়বার তার রূপ বদলায়। সুন্দরবনের করমজল বন্য ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র, হারবাড়িয়া ইকো সেন্টার, কটকা, কচিখালী ও নীলকমল অভয়ারণ্য, শেখেরহাট টেম্পল, কলাগাছিয়া ইকো ট্যুরিজম সেন্টার, মান্দারবাড়িয়া অভয়ারণ্য নামের স্পটগুলো পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত। এসব স্পটে কুমির প্রজনন, অসুস্থ হরিণের পরিচর্যা, হাজার বছরের পুরনো স্থাপনার ধ্বংসাবশেষসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যর্ উপভোগ করা যায়। ভাগ্য সহায় হলে হাঁটতে হাঁটতে বানর, হরিণ, গুইসাপ, কাঁকড়া অথবা কুমিরের ঘুরে বেড়ানো দৃশ্যও দেখতে পারেন। অল্প সময়ে কম খরচে সুন্দরবন ভ্রমণের স্বাদ নিতে হলে করমজলই শ্রেষ্ঠ। মংলা বন্দর থেকে নৌপথে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই ইঞ্জিনচালিত ছোট ছোট নৌকায় চড়ে এখানে যাওয়া যায়। এখানে কুমির প্রজনন কেন্দ্রে ছোট বড় অসংখ্য কুমির দেখতে পাবেন। সুন্দরবনের আরেকটি অভয়ারণ্য হিরণ পয়েন্ট। এটি পুরো সুন্দরবন এলাকার বনেদি অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। চারদিকে নদীঘেরা। সেখানে হরিণের দল পানি খেতে আসে। ভাগ্য সহায় হলে বাঘের পানি পানের দৃশ্যও দেখা যেতে পারে। খুলনা শহরে বর্তমানে বিদেশি মানের হোটেলসহ মানসম্মত অনেকগুলো হোটেল আছে। এর মধ্যে অন্যতম অভিজাত হোটেল সিটি ইন, হোটেল ক্যাসল সালাম, হোটেল রয়্যাল ইন্টারন্যাশনাল, টাইগার গার্ডেন। এসব হোটেলের ভাড়া একটু বেশি।

নিঝুম দ্বীপ:
নিঝুম দ্বীপ বাংলাদেশের একটি ছোট্ট দ্বীপ। নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত নিঝুম দ্বীপ। একে ‘দ্বীপ’ বলা হলেও এটি মূলত একটি ‘চর’। মূলত বল্লারচর, চর ওসমান, কামলার চর এবং চুর মুরি- এই চারটি চর মিলিয়ে নিঝুম দ্বীপ। প্রায় ১৪,০৫০ একরের দ্বীপটি ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে জেগে ওঠে। বাংলাদেশের বন বিভাগ সত্তরের দশকে বন বিভাগের কার্যক্রম শুরু করে। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে চার জোড়া হরিণ ছাড়ে। নিঝুম দ্বীপ এখন হরিণের অভয়ারণ্য। প্রায় ৯১ বর্গকিমি আয়তনের নিঝুম দ্বীপে ৯টি গুচ্ছগ্রাম রয়েছে। শীতের মৌসুমে অজস্র প্রজাতির অতিথি পাখির অভয়ারণ্যে পরিণত হয় নিঝুম দ্বীপ। নিঝুম দ্বীপে বিশাল এলাকা পলিমাটির চর। জোয়ারের পানিতে ডুবে এবং ভাটা পড়লে শুকায়। এই স্থানগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বসবাস। নিঝুম দ্বীপে রয়েছে কেওড়া গাছ। অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে জোয়ার ভাটার ওপর নির্ভর করতে হয় নিঝুম দ্বীপের মানুষদের। ঢাকায় যেতে হলে তাদের সকাল ৯টার (জোয়ার আসার) পর হাতিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করতে হয়। প্রায় ২-৩ ঘণ্টা সময় পর ট্রলার হাতিয়া পৌঁছায়। অতঃপর পাওয়া যায় ঢাকাগামী লঞ্চ, যেটি প্রতিদিন একবেলা ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে। এই লঞ্চটি বরিশাল এবং ভোলা হয়ে ঢাকায় পৌঁছায় বিধায় নিঝুম দ্বীপের মানুষ ভোলা কিংবা বরিশালে যেতে পারেন এই লঞ্চে করেই। এ ছাড়া হাতিয়া কিংবা ঢাকায় আসার জন্য রয়েছে বিকল্প পথ। বন্দরটিলা থেকে নদী পার হয়ে হাতিয়ায় পৌঁছতে হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন যানবাহন পার করে প্রথমে হাতিয়া শহরে তারপর লঞ্চে পার হয়ে মাইজদী অতঃপর ঢাকায় পৌঁছতে হয়।

নিঝুম দ্বীপে পর্যটকদের জন্য রয়েছে অবকাশের নিঝুম রিসোর্ট। যেখানে রয়েছে সাপ্লাই পানি এবং জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুতের ব্যবস্থা। খাবারের জন্য রয়েছে স্থানীয় হোটেল। সব মিলিয়ে পর্যটকদের মন জুড়াবে নিঝুম দ্বীপ।

বান্দরবান:
সবুজ আর পাহাড়ের অনন্য রূপ মিলেমিশে রয়েছে বান্দরবানে। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ ছুটে যায় প্রতিবছর। উল্লেখযোগ্য স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে নীলগিরি, স্বর্ণমন্দির, মেঘলা, শৈল প্রপাত, নীলাচল, মিলনছড়ি, চিম্বুকসহ বেশ কয়েকটি জায়গা। বান্দরবান জেলা সদর থেকে ৪৭ কি.মি. দক্ষিণ পূর্ব দিকে লামা উপজেলার অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২০০ ফুট ওপরে বাংলাদেশের নতুন পর্যটন কেন্দ্র নীলগিরির অবস্থান। যাকে বাংলাদেশের দার্জিলিং হিসেবে অবহিত করা যায়। নীলগিরি যেতে হলে আগে থেকে ল্যান্ডক্রুজার জিপ ভাড়া করতে হবে। এ ছাড়া রয়েছে স্বর্ণমন্দির। বর্তমানে স্বর্ণমন্দির উপাসনালয়টি বান্দরবান জেলার একটি অন্যতম পর্যটন স্পট হিসেবে পরিগণিত হয়। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম এই ‘বৌদ্ধ ধাতু জাদী’কে স্বর্ণমন্দির নামকরণ করা হয়। এটির নির্মাণশৈলী মিয়ানমার, চীন ও থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ টেম্পলগুলোর আদলে তৈরি করা হয়। তারপর যেতে পারেন মেঘলা। বান্দরবান জেলা শহরে প্রবেশের ৭ কি.মি. আগে মেঘলা পর্যটন এলাকাটি অবস্থিত। এটি সুন্দর কিছু উঁচু নিচু পাহাড়বেষ্টিত একটি লেককে ঘিরে গড়ে উঠে। ঘন সবুজ গাছ আর লেকের স্বচ্ছ পানি পর্যটককে প্রকৃতির কাছাকাছি টেনে নেয় প্রতিনিয়ত। শৈল প্রপাত। শৈল প্রপাত বান্দরবান শহর হতে ৭ কি.মি. দক্ষিণ পূর্বে চিম্বুক বা নীলগিরি যাওয়ার পথে দেখা যাবে। পাহাড়ের চূড়া থেকে চারদিকের সবুজ প্রকৃতির সৌন্দর্য অবগাহন এখানে প্রকৃতিপ্রেমীদের টেনে আনে। ঢাকা থেকে ট্রেনে বা বাসে প্রথমে চট্টগ্রাম তারপর চট্টগ্রাম থেকে সোজা বান্দরবান। এতে খরচ পড়বে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। তাপর চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবান।

বান্দরবানে পর্যটন করপোরেশনের একটি হোটেল আছে মেঘলাতে। যার ভাড়া রুম প্রতি ৭৫০ হতে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। হোটেলগুলোতে রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থা আছে। বান্দরবানে সব হোটেলে খাবারের মানের চেয়ে দামটা বেশি।

বিরিশিরি:
সীমান্তের অপরূপ মায়াঘেরা ছায়াঢাকা গ্রাম বিরিশিরি। নেত্রকোনা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। বিরিশিরিতে আছে শান্ত-স্বচ্ছ সোমেশ্বরীর সুনির্মল জল, আছে উজ্জ্বল বালুকাবেলা, সাদা কাশবন আর আছে গারো-হাজংদের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা। বর্ষায় সোমেশ্বরীর তীরবর্তী বিরিশিরির সৌন্দর্য বেড়ে যায় আরও কয়েক গুণ। দূরের পাহাড় থেকে নেমে আসা উত্তাল ঢলের রুদ্ধরূপ বর্ষায় বিরিশিরি ঘুরতে আসা পর্যটকদের দেখায় তার বন্য সৌন্দর্য। শান্ত-স্নিগ্ধ, সবুজে ঢাকা ছিমছাম পরিবেশ। এখানেই শান্ত-স্বচ্ছ সোমেশ্বরী। ধীরে বয়ে চলা এ নদীটি অসাধারণ সুন্দর। শান্ত-নিবিড় সোমেশ্বরী ধীরলয়ে বয়ে চলছে। ওপারে উপচেপড়া সবুজের হৃদয়কাড়া হাতছানি। উত্তরের হিমেল হাওয়া এবং সোমেশ্বরীর স্বচ্ছ জলধারা নিমিষেই যেন সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। সোমেশ্বরীর গভীরতাও অবিশ্বাস্য রকমের কম। এই নদীতে কয়লা পাওয়া যায়। গ্রামবাসী পানির নিচে ডুব দিয়ে তুলে আনে কালো সোনা। এই কয়লা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয় কল-কারখানায়। রপ্তানি পণ্য হিসেবে এর সম্ভাবনা উজ্জ্বল। ময়মনসিংহ থেকে বিরিশিরি পর্যন্ত রাস্তা মাত্র ৩৫-৩৬ কিলোমিটার। যাদের নিজস্ব বাহন নেই তাদের ঢাকা থেকে বাসে ময়মনসিংহ, তারপর দুর্গাপুর যেতে হবে বাস বা ম্যাক্সিতে। এ ছাড়াও দুর্গাপুর থেকে ছয় কিলোমিটার উত্তর সীমান্তে পাহাড়ের চূড়ায় রানীখং গির্জা অবস্থিত। এই পাহাড়ের চূড়া থেকে বিরিশিরির সৌন্দর্য যেন অন্য মাত্রা পায়। বিরিশিরির নিরিবিলি ছিমছাম শান্ত পরিবেশ মনে প্রশান্তি এনে দেয়। এমন পরিবেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেও আপনার খারাপ লাগবে না। ঢাকা থেকে যেতে সময় লাগে প্রায় চার ঘণ্টা। বিরিশিরি কালচারাল একাডেমির নিজস্ব রেস্ট হাউস ও জেলা পরিষদ ডাকবাংলো, ওয়াইএমসিএ নামক প্রতিষ্ঠানের গেস্ট হাউস আছে।

ঠাকুরগাঁও পঞ্চগড় টি গার্ডেন:

ঠাকুরগাঁও পঞ্চগড় টি গার্ডেন:
পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা ঠাকুরগাঁওয়ের পাড়িয়া সীমান্তে চা বাগান। ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় বিস্তৃত এই চা বাগানগুলো পর্যটকদের চোখ জুড়ায়। মাত্র কয়েক বছরের বব্যবধানে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা পাড়িয়া সীমান্তে নতুন চা বাগান গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের সর্ব উত্তরে হিমালয়কন্যা খ্যাত চার-তৃতীয়াংশ ভারত বেষ্টিত জেলা পঞ্চগড়। এখানে রয়েছে সমতল ভূমিতে চা-চাষের দৃশ্যমান বাস্তব উদাহরণ। অল্প সময়েই চা-চাষে দেশের তৃতীয় চা অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে এই জেলা। প্রায় ১২০ একর জমি চা বাগান গড়ে ওঠায় এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিস্তৃতি হয়েছে অনন্য রূপে। দেশের তৃতীয় চা অঞ্চল নামে খ্যাত পঞ্চগড় জেলার পাশাপাশি ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার পাড়িয়া সীমান্তবর্তী এলাকায়। পাশাপাশি পঞ্চগড় ঠাকুরগাঁও লালমনিরহাট জেলায় চা চাষের জন্য উপযোগী জমি থাকায় এই চা বাগান আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখানে রয়েছে প্রায় ৭০ হাজার একর জমি। বর্তমানে সেখানে আবাদ হচ্ছে ৩ হাজার একর জমিতে। ২০০০ সালে উত্তর জনপদের সীমান্তঘেঁষা জেলা পঞ্চগড় সমতল ভূমিতে চা চাষ শুরু হয়। তেঁতুলিয়া উপজেলায় বিচ্ছিন্ন গোচারণ ভূমিতে চায়ের সবুজ পাতা ভরে রয়েছে। জেগেছে সবুজের সমারোহ। পঞ্চগড় আলোকিত হয়ে উঠেছে চায়ের সবুজ আভায়। ২০০৫ সালে পঞ্চগড়ে প্রথম চা উৎপাদনের পাঁচ বছর পূর্বে ২০০০ সালে সূচনা হয় চা-চাষের। নতুন করে অনেকেই চা-চাষে আগ্রহী হওয়ায় বাড়ছে চা বাগানের পরিধি। সৃষ্টি হচ্ছে বেকারদের কর্মসংস্থান। ফলে উন্নত হচ্ছে এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট। সব মিলিয়ে খুব দ্রুতই দৃশ্যপট পাল্টাচ্ছে এখানকার। ভ্রমণপিপাসু মানুষেরা এখানে বেড়িয়ে আসতে পারেন হাতে একটু সময় পেলেই।

শ্রীমঙ্গল:

পাহাড় ও হাওরবেষ্টিত মৌলভীবাজার জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এমনই একটি উপজেলার নাম শ্রীমঙ্গল। এখানকার উঁচু-নিচু পাহাড়ের বুকে রয়েছে সারি সারি সবুজ চায়ের বাগান। প্রকৃতি আর বাগানে কাজ করা চা শ্রমিকদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক নান্দনিক সৌন্দর্যে। মূলত চা শিল্পকেন্দ্রিক বিধায় এ শহরটিকে চায়ের রাজধানীও বলা হয়। এ ছাড়া রয়েছে আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। ট্যুরিজমের জন্য শ্রীমঙ্গল হলো একটি চমৎকার জায়গা। শরতের এই কালে বা আসছে শীতের কোনো একদিনে ঘুরে আসতে পারেন শ্রীমঙ্গল থেকে। ৪২৫ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের জনপদ শ্রীমঙ্গলের সঙ্গে সারা দেশের রেল ও সড়কপথে রয়েছে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। প্রতিদিন ঢাকা থেকে তিনটি, চট্টগ্রাম থেকে দুটি আন্তঃনগর ট্রেনে করে শ্রীমঙ্গল আসতে পারেন। এ ছাড়া দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, পঞ্চগড়, টাঙ্গাইল ও রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে সরাসরি বাসে করে শ্রীমঙ্গল আসা যাবে। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থান থেকে ঢাকায় এসে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে হানিফ বা শ্যামলী বাসে করে শ্রীমঙ্গল আসতে পারবেন। শহরে এসে অটোরিকশা, অটো সিএনজি, জিপ, প্রাইভেট কার বা মাইক্রো ভাড়া করে আপনি দর্শনীয় স্থানে যেতে পারবেন। পর্যটকদের রাতযাপনের জন্য এখানে বেশ কয়েকটি হোটেল, রিসোর্ট, রেস্ট হাউস, কটেজ রয়েছে। অত্যন্ত সুরক্ষিত ও নির্জন পরিবেশে পাহাড়ি টিলার ওপর নির্মিত টি-রিসোর্ট ও পাঁচতারকা মানের গ্র্যান্ড সুলতান টি-রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের নজরকাড়া সৌন্দর্য পর্যটকদের বিমোহিত করে তোলে। বিভিন্ন পাহাড়ি টিলার ওপর নির্মিত কটেজগুলোতে রাতযাপন করে পর্যটকরা প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে অবলোকন করার সুযোগ পাবেন। শ্রীমঙ্গলে রয়েছে বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট। এখানেই রয়েছে খাবারের আয়োজন।

চর কুকরী-মুকরী:

চর কুকরী-মুকরী যারা একবার বেড়িয়ে এসেছেন তারা দ্বিতীয়বার ছুটে যাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্য একটি মাত্রা যোগ হয়েছে এখানে। এই প্রাকৃতিক বিস্ময়ের ভূস্বর্গ রয়েছে ভোলায়। বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপজেলা ভোলার মূল ভূখণ্ড থেকে দক্ষিণে মেঘনা নদী পার হয়ে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি চর কুকরী-মুকরীর অবস্থান। দ্বীপের পূর্বদিকে প্রমত্তা মেঘনা ও শাহাবাজ চ্যানেল। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে বুড়া গৌড়াঙ্গ এবং মেঘনার মিলনস্থল। চর কুকরী-মুকরীকে দ্বীপকন্যাও বলা হয়ে থাকে। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণী আর সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে সৌন্দর্যের এক বর্ণিল উপস্থিতি যা প্রকৃতি প্রেমিক পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বছর পুরনো এ চরে আজও সভ্যতার ছোঁয়া লাগেনি।

বঙ্গোপসাগরের কুলে মেঘনা-তেঁতুলিয়ার মোহনায় প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বিশাল বনাঞ্চল বেষ্টিত এ দ্বীপে বিচরণ করছে অসংখ্য হরিণ, গরু-মহিষ, বানর এবং নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। চর কুকরীতে যাওয়ার পথে বিস্তৃত বনায়ন মাঝেমধ্যে চিতাবাঘেরও উপস্থিতি টের পাওয়া যায় এ দ্বীপকন্যার বুকে। এখানে নিরাপদ নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা, হোটেল-মোটেলসহ আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে তা কুয়াকাটার চেয়েও নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে পরিণত হতে পারে। এর পাশাপাশি চর পাতিলা ও ঢালচরও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা পৃথক দুটি দ্বীপ। এখানেও শীতের সময় বিভিন্ন প্রজাতির পাখিসহ হরিণ, বালিহাঁস মানুষের মন জুড়ানো পরিবেশের সূচনা করে। ওটঈঘ চর কুকরী-মুকরীকে বিশ্ব জীববৈচিত্র্যের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করে। প্রায় ৪৫০ বছর আগে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে প্রমত্তা মেঘনার মোহনায় এ ভূখণ্ডের পত্তন ঘটে। কথিত আছে পত্তনের পর প্রথমদিকে এ চরে কুকুর আর ইঁদুরের প্রভাব ছিল খুব বেশি। ইঁদুরের আর এক নাম মেকুর, আর তা থেকে এ চরের নামকরণ করা হয় ‘চর কুকরী-মুকরী’। ভোলা সদর থেকে গাড়ি যোগে ১০০ কি.মি. পাড়ি দিয়ে কচ্ছপিয়া পৌঁছে সেখান থেকে পুনরায় ৩০ কি.মি. নৌকা-ট্রলার বা স্পিডবোটে মেঘনা নদী অতিক্রম করে এ দ্বীপে পৌঁছাতে হয়।

রাঙামাটি:

সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাঙামাটি। পাহাড়ের বুকে সূর্যালোক, ভরা পূর্ণিমা রাতে হ্রদের পানিতে মৃদু ঢেউয়ের ওপর জোছনার ঝলকানি আর গিরি নির্ঝর ঝরনার রূপমাধুরী দেখেনি যে, সে যেন অপরূপ পাহাড়ি অরণ্যের জনপদ রাঙামাটি দেখেনি। এলোমেলো সারিতে সাজানো উঁচু-নিচু ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড়ের সমাবেশ। এসব নিয়েই পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটি। যেদিকেই তাকাবেন যেন শৈল্পিক অাঁকা দৃশ্য। অাঁকাবাঁকা কাপ্তাই লেক। চারদিকেই স্বচ্ছ জলধারা। কাপ্তাই লেক মিশেছে প্রকৃতির সঙ্গে অপরূপ সাজে। প্রকৃতিপ্রেমীদের প্রতিনিয়তই যেন কাছে টানছে কাপ্তাই লেকের স্বচ্ছ জলধারা। এমন পাগল করা প্রকৃতির অদ্ভুদ সৌন্দর্যের অাঁধারে মিলিয়ে যেতে কার না মন চায়। তাই তো সময় পেলেই প্রকৃতিপ্রেমীরা ছুটে আসছেন রাঙামাটির দৃষ্টিকাড়া মনোরম পর্যটন স্পট আর নৈসর্গিক আবেশে, ঘুরে বেড়াচ্ছেন পাহাড়ে। ঢাকা থেকে রাঙামাটি যেতে সরাসরি চালু রয়েছে সৌদিয়া, ইউনিক, বিআরটিসি, ডলফিন, এস আলমসহ বিলাসবহুল বাস সার্ভিস। চট্টগ্রাম থেকে যাওয়া যায় খুব সহজে। চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৭৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পর্যটন শহর রাঙামাটি। চট্টগ্রাম শহর থেকে রাঙামাটি আসতে সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। চট্টগ্রামের মুরাদপুর বিশ্বরোডে আছে রাঙামাটির প্রধান বাস স্টেশন। যেখান থেকে ছাড়ে বিআরটিসি এবং বিরতিহীন বাস সার্ভিসসমূহ। একুট নিরিবিলি পরিবেশে থাকতে চাইলে উঠতে পারেন রাঙামাটি পর্যটন মোটেলে। প্রতিটি রুমের জন্য ভাড়া গুনতে হবে ৮০০ টাকা। আবার এসি ডবল রুমের ভাড়া পড়বে ১২০০ টাকা। এ ছাড়া বেসরকারি হোটেলে রাতযাপন করা হয়। রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জাদুঘরে রয়েছে পাহাড়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃৃতির প্রাচীন নিদর্শন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সাজেক ভ্যালি, আয়তন ৬০৭ বর্গমাইল। সম্প্রতি পর্যটন স্পট হিসেবে এটি পরিচিতি পেয়েছে।

কুয়াকাটা:

সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের জন্য বিখ্যাত কুয়াকাটা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য কুয়াকাটার প্রতিদ্বন্দ্বী আর কেউ নেই। নৈসর্গিক সৌন্দর্য অপরূপ। প্রকৃতির উপহার দীর্ঘ সাগর সৈকত সত্যিই বিস্ময়কর। বিশ্বের আকর্ষণীয় সমুদ্র সৈকতগুলোর মধ্যে কুয়াকাটা অন্যতম। কুয়াকাটার এই মনোরম সাগর সৈকতে গেলেই সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের মতো বিরল, বর্ণিল দৃশ্য সহজেই অবলোকন
করা যায়। তাও একই স্থানে দাঁড়িয়ে।

রাজধানী ঢাকা থেকে সরাসরি বিলাসবহুল চেয়ারকোচসহ বিভিন্ন পরিবহন যোগে যেতে পারেন কুয়াকাটায়। সে ক্ষেত্রে গাবতলী বাসস্ট্যান্ড অথবা সায়েদাবাদ টার্মিনালে গিয়ে টিকিট নিয়ে সকাল-বিকাল-রাত যে কোনো সময় বাসে যাত্রার ৮ ঘণ্টায় পৌঁছানো যাবে। যেতে পারবেন নদীপথে ডবল ডেকার লঞ্চযোগে। ঢাকা থেকে লঞ্চ ছাড়ার নির্দিষ্ট সময় প্রতিদিন বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। পৌঁছে যাবেন ১৪ ঘণ্টায়। সকালে পটুয়াখালী জেলা শহরে পৌঁছে রিকশা, অটোরিকশায় চেপে বাসস্ট্যান্ড থেকে যাত্রীবাহী বাসে কুয়াকাটা দুই ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন। এ ছাড়াও যেতে পারেন ভাড়ায়চালিত মিনিবাস, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেলযোগে। ঢাকা থেকে যেতে পারেন ডবল ডেকার লঞ্চযোগে। রাত ৯টায় ঢাকা ছেড়ে বরিশাল পৌঁছে বাসযোগে কুয়াকাটায়। বিদেশি অতিথি পর্যটকরা যদি ইচ্ছা করেন তাহলে দেশ ও বিদেশের যে কোনো ভ্রমণপিপাসুরা হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা থেকে ৪০ মিনিটে সরাসরি কুয়াকাটা হেলিপ্যাডে অবতরণ করতে পারেন। কুয়াকাটা পৌঁছে আপনি হেঁটেই আপনার বুকিং করা হোটেল-মোটেল-গেস্ট হাউসে উঠতে পারবেন। রয়েছে সরকারি পর্যটন হলিডে হোমস, সরকারি ভিআইপি ডাকবাংলো, ব্যক্তিমালিকানাধীন হোটেল-মোটেল, গেস্ট ও রেস্ট হাউস। খাবার হোটেল রয়েছে কুয়াকাটায় পর্যাপ্ত। কম মূল্যে আপনি পরিবারসহ পছন্দসই তৃপ্তি নিয়ে খাওয়া-দাওয়া করতে পারবেন।

Updated: July 21, 2016 — 12:29 am

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bdtips © 2015