বিছানায় বাঙালি কতটা পারদর্শী

imageপাড়ার ঠেক থেকে হোয়াটস্‌অ্যাপ গ্রুপ— এক প্রকার পুরুষ রয়েছেনই, যারা নিজেকে শয্যা-শার্দূল হিসেব প্রমাণে সদা-তৎপর। তাঁদের বিছানা-বড়াইয়ের দাপটে থরহরি থাকতে হয় ঠেক বা গ্রুপের বাকি সকলকে। কী জানান তাঁরা?
‘মেগের কাছে পেগের বড়াই’  বলে একটা প্রবাদ ছিল বটে ১৯ শতকে। সেটা হুতোমের আমল। কলকেতা জুড়ে কেবল বিলিক-ঝিলিকের চাষ। প্রাণকৃষ্ণ দাঁ যদি বারোটা রক্ষিতা রেখে থাকেন, বীরকৃষ্ণকে চৌদ্দটা রাখতেই হবে। নইলে প্রাণ বাঁচানো দায়, সখি মান বাঁচানো দায়। সেকালের কথা রাখি। একালেই বা কম কী? লাখ-বেলাখ বেতন প্রাপ্ত কর্পোরেট হিরোরা কি ‘পেগের বড়াই’ কিছু কম করেন?

সন্ধান-অনুসন্ধান করার উপায় নেই। বাংলা বাজারে কোনও জরিপ চালিয়ে বাঙালির বিছানা-বড়াইয়ের সত্য-মিথ্যা নিরূপণ করার কোনও সামাজিক যন্ত্র আজও উদ্ভাবিত হয়নি। ফলে বাঙালির বিছানা-বড়াইয়ের বেত্তান্তকে খানিকটা আন্দাজের উপরে আর খানিকটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপরে রাখতে হবে।

পাড়ার ঠেক থেকে হোয়াটস্‌অ্যাপ গ্রুপ— এক প্রকার পুরুষ রয়েছেনই, যারা নিজেকে শয্যা-শার্দূল হিসেব প্রমাণে সদা-তৎপর। তাঁদের বিছানা-বড়াইয়ের দাপটে থরহরি থাকতে হয় ঠেক বা গ্রুপের বাকি সকলকে। কী জানান তাঁরা? সেকথা হুবহু উদ্ধারে রীতিমতো বাধা রয়েছে। তবু রেখে ঢেকে যেটুকু বলা যায়, তার সারমর্ম এই— তাঁরা নাকি এক এক জন আস্ত ক্যাসানোভা, ডন হুয়ান। তাঁদের দেখলেই নারীকুল ধিতিং ধিতিং নাচতে নাচতে শুরু করেন। তার পরে তাঁকে ঘিরে ধরে টানতে টানতে সোজা বিছানায়…।

আর সেখানেই তিনি বাঘের খেলাটি খেলেন। তাঁর ভিতরে একই সঙ্গে গর্জন করতে থাকে সেরেঙ্গেটির সিংহ, সোঁদরবনের রায়বাঘা আর জাপান সাগরের গডজিলা। খেলা শেষ হলে তিনি রাজা। আর তাঁর সঙ্গিনীরা? তাঁরা সেই দাপটে কুমড়োলতা হয়ে পড়ে রয়েছেন কোথায়, কে তার খবর রাখে! এখন প্রশ্ন হল, এই বড়াই কতটা ভিত্তিসম্পন্ন? বাঙালির ঘর-গেরস্থালির খবর যাঁরা রাখেন, তাঁরা জানেন, এই কাহিনি একেবারেই কল্পনালতা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তেমন সামূহিক লাম্পট্য বাঙালির কাঁপে হল কই? শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বেশ কয়েকটি ব্যোমকেশ-কাহিনিতে তেমন কিছু ক্যাসানোভাকে হাজির করেছিলেন। ‘রক্তের দাগ’-এর সত্যকাম দাসকে অনেকেরই মনে থাকার কথা। বিবেকহীন লম্পট সত্যকামকে হত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেলন তারই ‘বাবা’ ঊষাপতিবাবু। সে কাহিনিতে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, সত্যকাম তার লাম্পট্যের কথা জনসমক্ষে লুকতো না। কিন্তু তার উচ্চারণ ছিল যাকে বলে অ্যাফরিস্টিক। আজকের ভাষায় যাকে ‘এক্সপ্লিসিট’ বলে, সেটা সেই সময়ে ছিল না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সমাজের সর্বত্রই এখই ধরনের এক্সপ্রেশন বহাল ছিল।

শরৎবাবুর জীবানন্দই হন, আর বিভূতিবাবুর বিপিন— কোনও লম্পটই তার লাম্পট্যকে লুকোয়নি। কিন্তু কতটা বলতে পেরেছে তারা?

কতটা বলতে পারা যায়?

মনোবিদরা জানাচ্ছেন, যাঁদের বিছানা-বড়াই যত বেশি, তাঁরা নাকি আসল খেলায় মোটেই তত পটু নন। আর এই অপটুত্ব ঢাকতেই তাঁদের এই জয়ঢাক পেটানোর ধুম। এটা কি কোনও রকম ভোকাল পারভারশন? সেখানেও মনোবিদরা ঘাড় কাত করে সায় দিচ্ছেন। আর পাঁচজনকে নিজের কল্পিত যৌনতার ফাঁপানো বর্ণনা শুনিয়ে নিজের ফ্যান্টাসিতে হাওয়া লাগান বেশিরভাগ বিছানা-বীর। আবহমানের হিসেব অনুযায়ী, বাঙালির অন্য বীরত্বে ‘ফুটুরে ডুম’ অনেকদিনই। আর এই ফেসবুক-টুইটারের কালে তার বাতেলা-সর্বস্বতাই শেষ কথা। হোয়াটস্‌অ্যাপ গ্রুপ হলে তো কথাই নেই। ডায়ালগে-কমেন্টে-শেয়ারে-মেমেতে-স্মাইলিতে সে এক জমজমাট কেস। যিনি বলেন, তিনি সিকন্দর। বাকিরা মুরগি। তাঁদের তা-ই ভবিতব্য।

Updated: April 5, 2016 — 12:43 am

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bdtips © 2015